মধ্যম নিকায়ের চুলবেদল্ল সূত্রের সারমর্ম by ভিক্ষু জ্ঞানবোধি 

সূত্রটি মূলত অরহত ধম্মদিন্না ভিক্ষুণী এবং উপাসক বিশাখার মধ্যে ঘটিত কথোপকথন। উপাসক বিশাখা তখন অনাগামী প্রাপ্ত। উল্লেখ্য যে গৃহী জীবনে তারা দু’জন স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘সক্কায়া’ বা ‘সদকায়’ কি? এর উত্পত্তি কোথায়? এর নিরোধ বা ধ্বংশ কোথায়? এবং কিভাবে তা সম্ভব? বিশাখার এসব প্রশ্নের উত্তরে ধর্মদিন্না বলেন: পঞ্চস্খন্দের উপাদানই হচ্ছে সদকায়, তিন প্রকারের তৃষ্ণা: কাম-তৃষ্ণা, ভব-তৃষ্ণা এবং বিভব-তৃষ্ণাই হচ্ছে এর উত্পত্তির কারণ, তৃষ্ণা থেকে মুক্তিই হচ্ছে এর নিরোধ এবং আর্য্য অষ্টাংগিক মার্গই হচ্ছে একমাত্র পথ যেটার অনুশীলনে এই স্কন্ধের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। পরবর্তী প্রশ্নটি ছিল জঠিল – পঞ্চউপাদানস্কন্ধই কি এই উপাদান নাকি এটা পঞ্চউপাদানস্কন্ধ হতে ভিন্ন? উত্তরে ধর্মদিন্না বললেন এটা একও নয় আবার ভিন্নও নয়। এটা হচ্ছে পঞ্চউপাদানস্কন্ধের প্রতি সৃস্ট রাগ বা তৃষ্ণা।

তাহলে কিভাবে সেটা সদকায়দৃষ্টি সৃষ্টিতে সাহায্য করে? এখানে যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য সেটা হচ্ছে এই সদকায়দৃষ্টি কার মধ্যে উত্পন্ন হয় এবং কার মধ্যে হয়না। একজন সাধারণ ব্যক্তি যিনি সম্পূর্ণরূপে পৃথকজন, আর্য্য পুরুষের সাক্ষাত কখনো পায়নি, ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ সে নিন্মলিখিত উপায়ে সদকায়দৃষ্টি সৃষ্টি করে। সে ভাবে রূপই আত্মা, রূপের সমন্বয়ে আত্মা, আত্মার মাঝেই রূপ, অথবা রূপের মাঝেই আত্মা। এভাবে সে পঞ্চস্কন্ধের প্রতিটি স্কন্ধকে সর্বমোট ২০ প্রকারে ভাবতে থাকে এবং সদকায়দৃষ্টি সৃষ্টি করে। অপরপক্ষে একজন আর্য্যপুদ্গল যিনি ধর্ম বিষয়ে সুশিক্ষিত তার নিকট এধরনের দৃষ্ঠি কখনো সৃষ্ঠি হয়না।

আর্য্য অষ্টাংগিক মার্গ যেটির অনুশীলনে এই মিথ্যাদৃষ্ঠি থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব সেটার স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন – ত্রিশিক্ষা: শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার মাঝেই আর্য্য অষ্টাংগিক মার্গ নিহিত। অর্থাত আর্য্য অষ্টাংগিক মার্গ মানেই শীল, সমাধি প্রজ্ঞা নয়। এই ত্রিশিক্ষার মধ্যে আরো অনেক বিষয় জড়িত আছে।

যেহেতু দু’জন সাধকের মাঝেই এই আলোচনাটি হচ্ছে এজন্য আমরা দেখতে পাই যে আর্য্য অষ্টাংগিক মার্গের আলোচনার পরপরই ভিক্ষুণী ধর্মদিন্না শীলের আলোচনা রেখে সমাধি বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন। সমাধি কি? সমাধির বৈশিষ্ট কি? কিসের উপর সমাধি নির্ভরশীল, সমাধির কাজ কি? সমাধি-ভাবনা আসলে কি? ইত্যাদি। এরপরে আলোচনা হয় সংস্কার সম্পর্কে। তিন প্রকারের সংস্কারের কথা আলোচিত হয়: কায়-সংস্কার (নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস), বাক্য-সংস্কার (বিতর্ক-বিচার) এবং চিত্ত-সংস্কার (বেদনা-সংজ্ঞা)। এরপর বেদনা ও সংজ্ঞা নিরোধ সমাপত্তি বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়।

বেদনা বা অনুভুতি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। এখানে উল্লেখ করা হয় যে তিন প্রকারের বেদনার মধ্যে সুখ-বেদনা সুখকর যতক্ষণ এটা স্থায়ী এবং দুঃখকর যখন এটা চলে যায়, অনুরূপভাবে দুঃখ-বেদনা দুঃখকর যতক্ষণ এটা স্থায়ী এবং সুখকর যখন এটা চলে যায়। সুখ ও দুঃখহীন বেদনা দুঃখকর যখন সেখানে জ্ঞান থাকেনা এবং সুখকর যখন সেখানে জ্ঞান থাকে।

সর্বশেষে বিশাখা কিছু ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেন যেগুলো ধর্মদিন্না থেরি বিচিক্ষনতার সহিত উত্তর দেন। আমি প্রশ্ন ও উত্তরগুলো নিন্মে ধারাবাহিভাবে উপস্থাপন করলাম।

বিশাখা জিজ্ঞেস করলেন:                                             ভিক্ষুণী ধম্মদিন্না বললেন:

মহাশয়া, সুখ বেদনার বিপরীতে কি?                        বিশাখা, সুখ বেদনার বিপরীতে দুঃখ বেদনা।

মহাশয়া, দুঃখ বেদনার বিপরীতে কি?                       বিশাখা, দুঃখ বেদনার বিপরীতে সুখ বেদনা।

মহাশয়া, সুখ ও দুঃখহীন বেদনার বিপরীতে কি?       বিশাখা, সুখ ও দুঃখহীন বেদনার বিপরীতে অজ্ঞতা।

মহাশয়া, অজ্ঞতার বিপরীতে কি?                              বিশাখা, অজ্ঞতার বিপরীতে জ্ঞান বা প্রজ্ঞা।

মহাশয়া, প্রজ্ঞার বিপরীতে কি?                                  বিশাখা, প্রজ্ঞার বিপরীতে বিমুক্তি।

মহাশয়া, বিমুক্তির বিপরীতে কি?                              বিশাখা, বিমুক্তির বিপরীতে নির্বাণ।

মহাশয়া, নির্বানের বিপরীতে কি?                              বিশাখা, নির্বানের কোনো বিপরীত নেই। নির্বাণই অধ্যাত্ম জীবনের সমাপ্তি। নির্বাণ লাভই সকলের কাম্য হওয়া উচিত।

ধম্মদিন্নার এমন ব্যাখ্যা শুনে বিশাখা অতীব আনন্দিত হলেন এবং সাধুবাদের সাথে তা অনুমোদন করলেন।

সাধু! সাধু! সাধু!

জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক!

Advertisements

Thank you for visiting our website. Let us know what you think about this.

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s