চূলসীহনাদ সূত্র বা সত্যজ্ঞানের সিংহ গর্জন by উপালি শ্রমণ

 

right-view
বুদ্ধ অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠী নির্মিত জেতবনারামে বসবাস কালে একদিন তথায় অবস্থানরত ভিক্ষুদেরকে উদ্দেশ্য করে এই সূত্র দেশণা করেন। এর মূল বিষয় হল বুদ্ধের সমকালীন আধ্যাত্মিকতার সাধনাকারী শ্রমণ ও পরিব্রাজকগণ প্রায় সকলেই সত্যের পরিপূর্ণ উপলব্ধির দাবী করতেন। তাদের কেউ ছিলেন শাশ্বতবাদী কেউ আবার নাস্তিকবাদী। এই সূত্রে বুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছেন কি কি কারণে এই দাবি সত্য কিংবা মিথ্যা হতে পারে।

বুদ্ধ বলেন, একমাত্র বুদ্ধের শাসনেই প্রথম (স্রোতাপন্ন,), দ্বিতীয় (সকৃদাগামী), তৃতীয় (অনাগামী), চতুর্থ (অরহত) শ্রমণ বিদ্যমান। অন্য মতবাদে তা নেই। একারণে বুদ্ধের অনুসারীগণ সিংহ-গর্জন করতে পারে। কিন্তু অন্য তীর্থক, পরিব্রাজকগণ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন – কিসের ভিত্তিতে বুদ্ধ চতুর্বিধ শ্রমণের অস্থিত্ব দাবী করেন? উত্তরে বুদ্ধ শিষ্যগণ বলে:
১। আমরা (বুদ্ধের অনুসারী গণ) শাস্তার প্রতি সম্পূর্ণরূপে প্রসন্ন,
২। আমরা তাঁর ধর্মের প্রতিও সুপ্রসন্ন,
৩। আমাদের শীলসমুহ আমরা পরিপূর্ণরূপে পালন করে থাকি,
৪। আমাদের গৃহী এবং প্রব্রজ্জ্যিত সহধর্মচারীগণ একে অপরের প্রতি প্রিয় এবং মনোজ্ঞ ব্যাবহার করে থাকি।

এর প্রত্যুত্তরে তাঁরাও তাঁদের শাসন সম্বন্ধে অনুরূপ দাবি করতে পারেন। তাহলে, স্বভাবতই প্রশ্ন উঠে – আধ্যাত্মিক গন্তব্য কি এক না অনেক?

এর যথাযথ উত্তর হবে – আধ্যাত্মিক গন্তব্য এক, অনেক নয়?

এই গন্তব্য নিশ্চই তারাই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যারা বীতরাগ, বীতদ্বেষ, বীতমোহ, বীততৃষ্ণ, নিরুপাদান বা উপাদানহীন, বিদ্বান, অননুরুদ্ধ ও প্রতিক্রিয়াশীল নন, নিষ্প্রপঞ্চ।

তারপর বুদ্ধ বলেন দুই ধরনের দৃষ্টি বা মতাবাদ বিদ্যমান – ভবদৃষ্টি (শাশ্বতবাদ) এবং বিভব দৃষ্টি (নাস্তিকবাদ)। এর মধ্যে যারা একটির অনুগামী তাঁরা অপরটিকে বিরুধিতা করেন। যারা যথাযথভাবে এই দুইটি দৃষ্টির সমুদয়, বিলয়, আস্বাদ, আদিনব, নিঃসরণ, পরিপূর্ণ রূপে জ্ঞাত নন তাঁরা রাগ, দ্বেষ, মোহাদি হতে মুক্ত নন।
তাদের মধ্যে যেহেতু রাগ, দ্বেষ, মোহাদি বিদ্যমান তাঁরা পরম সত্যোপলব্ধির দাবি নিয়ে সিংহ গর্জন করতে পারেন না। তাঁরা জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মরন ইত্যাদি দুঃখ থেকেও বিমুক্ত হতে পারেন না। দৃষ্টিদ্বয়কে যথাযথভাবে জেনে সেগুলোর পরিত্যাগ করার মাধ্যমেই দুঃখ মুক্তি সম্ভব।

তারপর বুদ্ধ বলেন চার প্রকার উপাদান বা আসক্তি বিদ্যমান – কামুপাদান, দৃষ্টি-উপাদান, শীলব্রতুপাদান, এবং আত্মবাদুপাদান। অনেকেই এই উপাদানগুলোর প্রথম তিনটির যেকোনো একটি বা কেউ কেউ তিনটিই বুঝতে সক্ষম হন। কিন্তু চতুর্থটি বুঝতে তাঁরা ব্যর্থ হন। সুতরাং তাদের শাস্তার প্রতি প্রসন্নতা, ধর্মে প্রসন্নতা, শীল পরিপালন, এবং সহধর্মচারীগণের প্রতি মনোজ্ঞ আচরণ সম্যক ভাবে করেন না। কারণ, তাঁরা সম্যক সম্বোধি প্রাপ্ত নয়। তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ সকল প্রকার উপাদান সমূহ পরিজ্ঞাত হয়ে সেগুলো থেকে বিমুক্তির পথ প্রদর্শণ করেছেন।

এই উপাদানগুলির নিদান, উৎস, প্রজননক্ষেত্র হচ্ছে তৃষ্ণা। তৃষ্ণার কারণ বেদনা, বেদনার কারণ স্পর্শ, স্পর্শের কারণ ষড়ায়তন, ষড়ায়তনের কারণ নাম-রূপ, নামরূপের কারণ বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কারণ সংস্কার, সংস্কারের কারণ অবিদ্যা। সুতরাং অবিদ্যা ক্ষীণ বা ধ্বংস করে বিদ্যার উৎপন্ন হলে কামুপাদান, দৃষ্টি-উপাদান, শীলব্রতুপাদান, এবং আত্মবাদুপাদানের উদয় হয় না। তখন সে নিরাসক্ত থাকে উত্তেজিত হয় না। এবং এভাবে নির্বাণ উপলব্ধি করে। তখন সে বুঝতে পারে যে তার জন্মের পরিসমাপ্তি হয়েছে, ব্রহ্মচর্য্যের পরিপূর্ণ বাস হয়েছে, কর্তব্যের সুসম্পাদন হয়েছে, এবং পুনর্জন্মের আর সম্ভাবনা নেই।
(মধ্যম নিকায়, ১০)

 

Advertisements