দশম সংঘরাজ জ্যোতিপাল মহাথের – ভিক্ষু জ্ঞানবোধি

ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় কেমতলি গ্রাম। জনবহুল বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলাধীন লাকসাম থানার বরইগাঁও জনপদে একটি ছোট্র পল্লী। এই পবিত্র ভূমিতে বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে বাবু চন্দ্রমণি সিংহ ও শ্রীমতি দ্রোপদীবালার কোলে ১৯১৪ সালে এক মহাপন্ডিতের ভূমিষ্ঠ হয়। কে জানত এই শিশু একদিন কেমতলি গ্রাম ছাড়িয়ে বাংলার বুকে একটি নিজস্ব স্থান গড়ে নিবে। কে জানত এই শিশু শুধু বরইগাঁও জনপদ নয় বরং গোটা বাংলার বৌদ্ধ তথা বঙ্গভূমির জন্য কল্যাণকারী মহামানবদের একজন হিসেবে স্থান গড়ে নিবে।

তাঁর গৃহী নাম দারিকা মোহন সিং। শিশুটি যখন ১২ বছরে পা দিল তাকে বুদ্ধ শাসনে প্রব্রজ্জ্যিত করা হয়। ক্রমে ২৪ বছর বয়সে ১৯৩৮ সালের ১৪ই জুলাই উপসংঘরাজ পণ্ডিত শ্রীমত গুনালংকার মহাস্থবিরের উপাধ্যাযত্বে তিনি উপসম্পদা প্রাপ্ত হন। অতঃপর স্বনামধন্য পাহাড়তলী মহামুনি পালি কলেজে পণ্ডিত শ্রীমত ধর্মাধার মহাস্থবিরের তত্বাবধানে অধ্যবসায়ের সহিত পালি ভাষা, সাহিত্য ও বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন বিষয়ে ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে কলকাতা ধার্মাংকুর বিদ্যাভবনে শ্রীমত বংশদ্বীপ মহাস্থবিরের নিকট পালি ভাষায় ধর্ম শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এরপর বঙ্গীয় সংস্কৃতি পরিষদ হতে তিনি বিনয় ও অভিধর্ম বিভাগে উপাদি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণ পদক লাভ করেন। তিনি তাঁর জীবনে সাহিত্য চর্চাকে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁরই ফলশ্রুতিতে তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন যেগুলো বাঙ্গালী বৌদ্ধসাহিত্যে তাঁর অমর সৃষ্ঠি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: ১) কর্মতত্ব, ২) পুদগল প্রজ্ঞপ্তি, ৩) মালয়েশিয়া ভ্রমণ কাহিনী, ৪) বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামে, ৫) বোধি চর্য্যাবতার, ৬) সাধনার অন্তরায়, ৭) বুদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষা, ৮) সৌম্য সাম্যই শান্তির কারণ, ৯) প্রজ্ঞাভূমি নির্দেশ, ১০) ভারতে বৌদ্ধ, ১১) ব্রম্ম বিহার, ১২) চর্যাপদ, ১৩) বুদ্ধের জীবন ও বাণী, ১৪) গুরুদেব গুনালংকার মহাস্থবির, ও ১৫) রবীন্দ্র সাহিত্যে বৌদ্ধ সংস্কৃতি। তাঁর রচিত উক্ত গ্রন্থসমূহের মধ্যে চর্যাপদ চট্রগ্রাম বাংলা বিভাগে এবং পুদগল প্রজ্ঞপ্তি, বোধিচর্যাবতার এবং প্রজ্ঞাভূমি নির্দেশ চট্রগ্রাম পালি বিভাগে পাঠ্য পুস্থকের মর্যাদা লাভ করেছে।

এছাড়াও তাঁর রচিত ধর্ম ও সমাজ সম্পর্কিত বহু প্রবন্ধ বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বোধিপত্র নামে এক ত্রৈমাসিক পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। এতে তাঁর জ্ঞানের সুবিন্যস্থ প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়।সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি তিনি তাঁর জন্মস্থান বরইগাঁও-এ পালি পরিবেন, সমাজ কল্যাণ সংস্থা, অনাথ আশ্রম, পাবলিক লাইব্রেরী, উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, সমবায় সমিতি সহ অনেক সমাজ কল্যাণ মূলক কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।

তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের কল্যানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। এর একটি পরিপূর্ণ চিত্র তাঁর রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামে’ বইটিতে পাওয়া যায়। উক্ত গ্রন্থের পরিচিতিতে কথা সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, অধ্যাপক ডক্টর আবুল ফজল বলেন – “মহামানব গৌতম বুদ্ধের সাম্য-মৈত্রী-করুনা ও অহিংসার আদর্শে নিবেদিত প্রাণ গৈরিক বসনধারী এই বৌদ্ধ ভিক্ষু মুক্তিসংগ্রামকালীন কর্মতৎপরতা, বিশেষতঃ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত থেকে শুরু করে শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, জাপান প্রভৃতি দক্ষিণপূর্ব এশীয় বৌদ্ধ প্রধান দেশগুলোতে ব্যাপক প্রচার ও তাঁর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ জ্ঞাপন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে বিশ্বজনমত প্রভূত সহায়তা করেছিল।”

শ্রীমত জ্যোতিপাল মহাথের তাঁর বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকান্ডের জন্য অনেক পুরুস্কারে ভুষিত হন। তাঁর বিভিন্ন পুরুস্কারের মধ্যে – ১) ত্রিপিটক বিশারদ (গোল্ড মেডালিস্ট), ২) মহাধর্মনিধি, ৩) বিশ্বনাগরিক, ৪) ধর্ম ও শান্তি পুরুস্কার, ৫) অগ্রমহাসদ্ধর্মজ্যোতিকাধজ্বা, ৬) একুশে পদক, ৭) স্বাধীনতা পদক, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য.

২০০২ সালের ১২ই এপ্রিল এই মহান পুরুষ ইহধাম ত্যাগ করেন।

Advertisements

Thank you for visiting our website. Let us know what you think about this.

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s