শ্রী উমেশচন্দ্র মুচ্ছদ্দী’র সংক্ষিপ্ত জীবনী – ভিক্ষু জ্ঞানবোধি

বাঙালী বৌদ্ধইতিহাসে সমাজ বিনির্মাণে যে কয়জন মহাপুরুষ স্বার্থহীনভাবে আত্মত্যাগ করেছেন শ্রী উমেশচন্দ্র মুচ্ছদ্দী তাদের মধ্যে অন্যতম| ১৮৮১ সালের ১১ই নভেম্বর পিতা রামমনি মুচ্ছদ্দী ও মাতা জুরবতী মুচ্ছদ্দীর কোল আলোকিত করে রাউজান থানার মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে জন্ম নেন এই মহাপুরুষ| পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান উমেশ্চ্ছন্দ্র বাল্যকালে মাত্র ৪ বৎসর বয়সে পিতৃহারা হন| তার মা তাকে ভর্তি করিয়ে দেন মহামুনি মডেল স্কুলে| সেখান থেকে চট্রগ্রাম কলিজিয়েট স্কুল| ছাত্র হিসেবে উমেশ ছিল বেশ মেধাবী| মধ্য ইংরেজী পরীক্ষায় বিশেষ বৃত্তি লাভ করেন| ১৯০০ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষা পাশ করেন আর ১৯০২ সালে চট্রগ্রাম কলেজ থেকে পাশ করেন এফ এ| আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন আর পড়া হয়নি| একদিন মায়ের অগোচরে মেদিনীপুরে পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরের চাকুরিতে যোগ দেন| চাকুরীর তের দিনের মধ্যে বদলী হয়ে চট্রগ্রামে আসেন| মনে যেহেতু উচ্চ শিক্ষার প্রচন্ড আখাংকা ছিল কতৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ১৯১১ সালে আইন কলেজে ভর্তি হয়ে যান| অতঃপর মায়ের নির্দেশে পুলিশের চাকুরী হতে ইস্তফা দিয়ে প্রথমে মুন্সেফ আদালতে, পরে জেলা আদালতে আইন ব্যবসায় নামেন| অচিরে লব্ধ-প্রতিষ্ট আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন| এই সময়ে সমাজসেবার আখাংকা  নিয়ে পিছিয়ে পরা বৌদ্ধ সমাজের উন্নয়নের জন্য নানামুখী কর্মপ্রচেষ্টায় ব্রতী হন| ১৯১১ সালে সৈয়দবাড়ি মাধ্যমিক ইংরেজী স্কুলকে উচ্চ-মাধ্যমিকে পরিনত করার জন্য নেতৃত্ত্ব দেন| স্ব-গ্রামে বৌদ্ধ যুব সমিতি প্রতিষ্ঠা করে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় উৎসাহ যোগান| এছাড়াও বিভিন্ন সমাজ উন্নয়ন মূলক কাজ করে এই মহৎপ্রান ব্যক্তি| তার কর্মের কথা বলতে গেলে উল্লেখ করতে হয় — তিনি বালিকাদের শিক্ষার জন্য বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্টায় জনগনকে উদ্বুদ্দ করেন| মহামুনি প্রমথ চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভুমিকা রাখেন| মহামুনি ডাকঘরে টেলিগ্রাফ ব্রাঞ্চ স্থাপনের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন| মহামুনি উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় ও চট্রগ্রাম বৌদ্ধ সমিতির কার্যকরী কমিঠিতে থেকে তিনি বিভিন্ন ভাবে সমাজের উন্নয়ন সাধন করে গেছেন| তিনি ১৯২০ সালে বৌদ্ধ কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেনযেখান থেকে অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছেন| এবং রামধন সৃতিবৃত্তি প্রবর্তন করেন সেখান থেকে সিংহলে গিয়ে পালি শিক্ষার জন্য বৃত্তি দেয়া হত| এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সম্মেলনে যোগদান করেন ও বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য বৌদ্ধ সংঘঠনগুলোর সংযোগ স্থাপনের জন্য বিশেষ ভাবে কাজ  করে যান| ১৯৫০ সালে তিনি রাঙ্গুনিয়া পশ্চিম শিলকে তৎকালীন মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহারের সভাপতিত্বে একটি বৌদ্ধ মহা সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং বাঙালী বৌদ্ধদের পরিস্থিতি, সমস্যা এবং সরকারের কাজ থেকে তাদের চাহিদা সংক্রান্ত বিষয়ে একটি বিশেষ বক্তব্য প্রদান করেন| আন্তর্জাতিক পরিধিতে তিনি সিংহলে অনুষ্ঠিত ১৯৫০ সালে বিশ্ব-বৌদ্ধ সম্মেলনে যোগদান করেন| কলকাতা ধর্মান্গ্কুর সভায় বিশ্ববৌদ্ধ সম্মেলন ও আমাদের সমাজ বিষয়ে বিশেষ বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে সবাইকে সচেতনতার আহ্বান জানান| এবং নেপাল ভ্রমনে গিয়ে কাটমুন্ডুতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তীর্থ যাত্রীদের লুম্বিনি যাতায়তের পথ প্রশস্ত করার জন্য আবেদন করেন এবং নেপাল সরকার সেই প্রস্তাবে রাজি হন ও পরবর্তিতে কাজটি সম্পাদন করেন| এছাড়াও দেশ-বিদেশে আর্ত-পীড়িত মানুষের সেবার জন্য তিনি অনেক কাজ করেছেন| তিনি সমাজে পন বা যৌতুক প্রথা বন্ধ করার জন্য বিশেষ ভুমিকা পালন করেন| ১৯৪৯ সালে তিনি ভারতের প্রধান মন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর উদ্যোগে লন্ডন মিউজিয়াম থেকে সারিপুত্র ও মহা মৌদগল্যায়নের পুতাস্থি এনে অর্পনকালে বিশ্ব বৌদ্ধ সম্মেলনে বাঙালী প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন| ১৯৫৯ সালে বাবা সাহেব ড. আম্বেদকর প্রতিষ্ঠিত নাগপুরের অল ইন্ডিয়া বুদ্ধিস্ট রিলিজিয়াস কনবেনশন এ সভাপতিত্ব করার আমন্ত্রণ পান| এভাবে তিনি শুধু সমাজকর্মই করে যাননি, পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চাও করেন| তার রচিত গ্রন্থসমূহ লক্ষ্য করলে আমরা বুঝতে পারি তিনি কতটা সমাজ হিতশী ছিলেন| তাঁর রচিত পুস্থকের মধ্যে নিন্মলিখিত কয়েকটি:

) মাতৃ পূজায় মানব ধর্ম (১৯২৫)

) বড়ুয়া জাতি (১৯৫৯)

) বৌদ্ধধর্মের মূল তত্ত্ব হিন্দু ধর্ম হইতে ইহার পার্থক্য (১৯৪৫)

) বিশ্বে বৌদ্ধ কৃষ্ঠি সভ্যতার দান এবং বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যত (১৯৫৮)

) পাকিস্থানি ভিক্খুগনের মিলনে আমার শেষ বক্তব্য (১৯৬২)

তার ইংরেজী গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

1) Outlines of Buddhism and How Far it differs from Hinduism (1945)

2) Buddhism’s contribution to world culture and civilizations and future of Buddhism (1958)

3) Gift of merit (1964)

বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন চর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি অনেক সম্মানসূচক অভিধায় ভুষিত হয়েছেন: যেমন ‘সদ্ধর্ম প্রবর্তক‘, ‘ধম্মো বিজয়্তাং‘, ‘তত্ত্ব চিন্তামনি‘ , ‘বিদ্যানিধি’, ‘সাহিত্যরত্ন‘ ইত্যাদি| পরিশেষে বলতে হয় তাঁর সমস্থ জীবনের ধ্যান ধারণা ও স্বপ্ন ছিল সমাজের ঐক্য ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণ সাধন| তিনি একাধারে বিশিষ্ট সমাজসেবী, যুক্তিবাদী, সমালোচক, দার্শনিক, সদ্ধর্ম প্রচারক, সংঘঠক, বাগ্মী, সুলেখক ও তত্যানুসন্ধানী| তার মতো প্রতিভাদীপ্ত সিংহ পুরুষ সমাজে বিরল| সেই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব উমেশ্চ্ছন্দ্র মুচ্চুদ্দী ১৯৬৫ সালের ১১ ই অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন|

 

Advertisements

2 thoughts on “শ্রী উমেশচন্দ্র মুচ্ছদ্দী’র সংক্ষিপ্ত জীবনী – ভিক্ষু জ্ঞানবোধি

  1. All Buddhists of present Bengal should know the life story of Shree Umesh Chandra Mutsuddi. We should all be influenced by his strength, courage, and his active participation in the advancement of the Bangali Barua Society. Just look at his life how much difficulty he faced…and how much works he has done…starting from…establishing education institute, promoting women education, establishing local bank, giving scholarship to poor and brilliant students, organizing great Buddhist conferences, writing about the social situation of the time and providing necessary suggestions for its improvement…etc. etc. We should all be encouraged by this extra-ordinary figure of Bengal.

    Like

Comments are closed.